সংবাদ শিরোনাম :

Advertisement

আত্মসমর্পণকারী নিয়াজীর গ্রন্থেও স্বাধীনতার ঘোষক শেখ মুজিব, কোথাও নেই জিয়া

আত্মসমর্পণকারী নিয়াজীর গ্রন্থেও স্বাধীনতার ঘোষক শেখ মুজিব, কোথাও নেই জিয়া

সোহেল সানি:
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে যে ব্যক্তিটির আত্মসমর্পণের মাধ্যমে, সেই পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল এএকে নিয়াজির যুদ্ধ নিয়ে রচিত “দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান” নামক গ্রন্থে পাকিস্তানের প্রতিপক্ষ হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমানের নামই উঠে এসেছে।
স্বাধীনতার ঘোষনাদানকারীও বলা হয়েছে শেখ মুজিবকে। গ্রন্থটিতে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বদাতা হিসাবে এসেছে জেনারেল ওসমানীর নাম।
গ্রন্থটিতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ২৭ মার্চে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার কোন অস্তিত্ব নেই।
‘৭১ এর যুদ্ধের প্রকৃতি, পাকিস্তানের ভাঙ্গন, যুদ্ধ পরিকল্পনা, আক্রমণ, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী, আলবদর, আলসামস্ সহ রাজাকার বাহিনী, যুদ্ধ শিবির, গোপনীয় রিপোর্ট, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান সেনাপ্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ খানের ভুমিকা এবং বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথকমান্ড, তথা মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণের প্রেক্ষিত ও বাধ্যবাধকতার নিখুঁত বর্ননা করা হয়েছে গ্রন্থটিতে।
পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য লে. জেনারেল নিয়াজি শুধু জেনারেল ইয়াহিয়া, জেনারেল টিক্কা খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোকে দায়ীই করেননি, তাদের তিনজনকে পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিত করেছেন। নিয়াজি বিশ্বাস করতেন, পূর্ব পাকিস্তান সংকট একটি রাজনৈতিক সংকট। যার সমাধান কোনো সামরিক যুদ্ধের মাধ্যমে হতে পারে না। তিনি দাবি করেছেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে জরুরি বার্তায় বলেছিলেন সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। কিন্তু ইয়াহিয়া তার আবেদনে সাড়া দেননি। বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ নিপীড়নের কথাও স্বীকার করেছেন। যদিও নিয়াজি সেই শাসকগোষ্ঠীর নিদের্শেই দায়িত্বপালন করেছেন কেন সেবিষয়ে নিজস্ব মত তুলে ধরেছেন। নিয়াজি লিখেছেন উপরের নির্দেশেই তাকে যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। যা চরম অপমানের, তার চেয়ে মৃত্যুবরণ করা ভালো হতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে নিয়াজি কিন্তু আত্মমর্যাদার জন্য মৃত্যুবরণ করেননি, আত্মসমর্পণ দলিলে সাক্ষর করে মিত্রবাহিনীর হাতে বন্দীত্ববরণ করেন। গ্রন্থটিতে নিয়াজি বলেছেন, জুলফিকার আলী ভুট্টো সিজারের চেয়ে পরাক্রমশালী ছিলেন। ক্ষমতাবলে হয়েছিলেন চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, এ পদবী তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায়ও ব্যবহার করেন। যে কারণে আমার গ্রন্থটির প্রকাশ বিলম্বে হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে ভারতীয় হামলা সম্পর্কে অবগত করলে, তিনি বলেন ‘পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আমি কি করতে পারি? আমি পারি কেবল প্রার্থনা করতে।’ এই বাক্যটি দ্বারা ইয়াহিয়া রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তার সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য শেষ করেন। পশ্চিম পাকিস্তান রক্ষা করতেই আমাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়।
গ্রন্থে নিয়াজি লিখেন, ‘৭১ সালের ১৪ মার্চ ভুট্টো দুজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের প্রস্তাব করে বলেছিলেন, তিনি নিজে হবেন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আর মুজিব হবেন পূর্বপাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি (ভুট্টো) ‘ওধার তুম ইধার হাম’ বলতে দুটি পাকিস্তানকে বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছিল না। কারণ আওয়ামী লীগ এমন এক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যেখান থেকে তার ফেরার পথ ছিল না। ২৩ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে পালন করা হয় প্রতিরোধ দিবস। মুজিবের বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়। মুজিব কর্নেল ওসমানীকে সার্বিক অপারেশনের কমান্ডার নিযুক্ত করেন। মেজর জেনারেল (অবঃ) মাজেদের তত্ত্বাবধানে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের তালিকাভুক্ত করা হয়। ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আসতে থাকে।. ভারতের সক্রিয় সহযোগিতায় সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। নিয়াজি লিখেছেন, মনে রাখা প্রয়োজন যে, তখনো বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করেনি। ২৫ ও ২৬ মার্চ মধ্যরাতে জেনারেল টিক্কা আঘাত হানেন। একটি শান্তিপূর্ণ রাত পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে, চারদিকে আর্তনাদ, অগ্নিসংযোগ। জেনারেল টিক্কা তার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যেন তিনি তার নিজের বিপথগামী লোকের সঙ্গে নয় শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছেন। ২৫ মার্চের সেই সামরিক অভিযানের হিংস্রতা ও নৃশংসতা বুখারায় চেঙ্গিস খান, বাগদাদে হালাকু খান এবং জালিয়ানওয়ালাবাগে বিট্রিশ জেনারেল ডায়ারের নিষ্ঠুরতাকেও ছাড়িয়ে যায়। সশস্ত্র বাঙালি ইউনিট ও ব্যক্তিবর্গকে নিরস্ত্র এবং বাঙালি নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করার জন্য টিক্কা খানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি এ দায়িত্ব পালন করার পরিবর্তে বেসামরিক লোকজনকে হত্যা এবং পোড়া মাটি নীতি গ্রহণ করেন। তিনি তার সেনাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আমি মাটি চাই মানুষ নয়।’ মেজর জেনারেল ফরমান ও বিগ্রেডিয়ার জাহানজেব আরবাব ঢাকায় তার এ নির্দেশ পালন করেন। জেনারেল রাও ফরমান তার টেবিল ডায়েরিতে লিখেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের শ্যামল মাটি লাল করে দেয়া হবে। ‘বাঙালির রক্ত দিয়ে মাটি লাল করে দেয়া হয়েছিল।’৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙালিরা গভর্নর হাউজ (বঙ্গভবন) অবরোধ করার পর তারা ফরমানের ডায়েরি খুঁজে পায়। বাংলাদেশ সফরকালে মুজিব ভুট্টোকে এ ডায়েরি দেখিয়েছিলেন। নিয়াজি লিখেন, আমার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ভুট্টো এ ডায়েরি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাকে আমি আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানতাম না।
জেনারেল টিক্কা তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন থেকে সরে যাওয়ায় সকল বাঙালি সশস্ত্র ব্যক্তি ও ইউনিট তাদের অস্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, সাজসরঞ্জাম ও পরিবহন নিয়ে পালিয়ে যায়। এবং মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করে।..মুজিব ছাড়া সকল নেতৃবৃন্দ পালিয়ে যায় এবং কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে। ২৫ ও ২৬ মার্চ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ত্যাগের আগে তিনি টিক্কাকে বলেছিলেন, ‘তাদেরকে খুঁজে বের করো।’ টিক্কার নিষ্ঠুরতা দেখার জন্য ভুট্টো ঢাকায় থেকে গেলেন। ভুট্টো দেখতে পেলেন ঢাকা জ্বলছে। তিনি জনগণের আর্তচিৎকার, ট্যাংকের ঘড় ঘড় শব্দ,রকেট ও গোলাগুলির বিস্ফোরণ এবং মেশিনগানের ঠা-ঠা-ঠা আওয়াজ শুনতে পেলেন। সকালে ভুট্টো পিঠ চাপড়িয়ে অভিনন্দন জানান টিক্কা, ফরমান ও আরবাবকে। তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশ্বাস দেন। ভুট্টো তার কথা রেখেছিলেন। টিক্কা খান পাকিস্তানের চিফ অব স্টাফ (সেনাপ্রধান) হিসাবে নিযুক্তি পেয়েছিলেন। রাও ফরমান আলী ফৌজি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং আরবাব লেঃ জেনারেল পদে উন্নীত হন।
‘৭১ সালের ২ এপ্রিল সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আব্দুল হামিদ খান আমাকে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে ডেকে পাঠান। তিনি জানান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া টিক্কা খানের ওপর সন্তুষ্ট নন।.. প্রেসিডেন্ট আপনাকে ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর কোনো প্রশ্ন? আমি বললাম একজন সৈনিকের কর্তব্য হচ্ছে নির্দেশ পালন করা। ৪ এপ্রিল ঢাকা পৌঁছালাম।
ঢাকা পৌঁছানোর এক সপ্তাহ পর ১০ এপ্রিল টিক্কা অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমার কাছে কমান্ড হস্তান্তর করেন। তারপরও জেনারেল টিক্কা খান গর্ভনর ও সামরিক আইন প্রশাসকও ছিলেন।
মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে নিয়াজি লিখেছেন, ‘৭১ সালের ২৫ মার্চ সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় সব পূর্বপাকিস্তানি পুলিশ, পূর্বপাকিস্তান রাইফেলস, আনসার, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কয়েকটি নিয়মিত ইউনিটের পূর্বপাকিস্তানি সদস্যরা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এসব লোক নেতৃত্বসহ মুক্তিবাহিনীর নিউক্লিয়াস গঠন করে। বিদ্রোহী বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৬২ হাজার। ভারতীয় ও রুশরা পর্যায়ক্রমে আরো ১ লাখ ২৫ হাজার বেসামরিক লোককে প্রশিক্ষণ দেয়। এভাবে মুক্তিবাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫শ’। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনগুলো সংকটকালে গোপনে তাদের জঙ্গি গ্রুপগুলোকে সংগঠিত এবং তাদেরকে হালকা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও প্রাক্তন সৈন্যরা বিপুল সংখ্যায় এসব সংগঠনে যোগদান করেন। তারা বিদ্রোহী নেতৃত্বের নিউক্লিয়াস গঠন করেন। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল এসব লোক একত্রিত হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনী নামে একটি পৃথক বাহিনী গঠন করে। ১৪ এপ্রিল কর্নেল এমএজি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। বিদ্রোহীদের সাধারণত মুক্তিযোদ্ধো বলা হতো।
একটি সংগঠিত রাজাকার বাহিনী বাহিনী ছাড়াও আল বদর ও আল শামস নামে আরো দুটি পৃথক বাহিনী গঠন করা হয়। স্কুল মাদ্রাসায় শিক্ষালাভকারীদের আলবদর বাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে বিশেষ অপারেশনের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আল শামসকে সেতু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়। রাজাকার বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার। তারা নির্ধারিত লক্ষ্য মাত্রার ৭০ শতাংশ অর্জন করেছিল। রাজাকার প্লাটুন ও কোম্পানি কমান্ডারদের প্রশিক্ষণ দানে ব্যাটল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ বাহিনীকে একটি কার্যকর কমান্ড কাঠামো প্রদানে প্রায় ৬০ জন তরুণ অফিসারকে রাজাকার গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে নিয়োগদানের জন্য বাছাই করা হয়। তাদেরকে স্বয়ংক্রিয় অস্রে সজ্জিত করা হয়েছিল। ২৭৫টি এলএমজি ও ৩৯০টি স্টেনগান তাদের দিয়েছিলাম। কিন্তু এতে তারা সন্তুষ্ট ছিলো না। তারা ২৫০০টি মেশিনগান আশা করছিল।
নিয়াজি লিখেন, গোটা পরিস্থিতি সম্পর্কে মাওলানা মুফতী মাহমুদের গভীর অন্তঃদৃষ্টিতে আমি অত্যন্ত মুগ্ধ হই। তিনি বলেন, শক্তি প্রয়োগ নিস্ফল হবে গণআন্দোলন বেশিদিন দমন করে রাখা যাবে না। এ সমস্যা মূলত রাজনৈতিক।
মুজিব একতরফাভাবে স্বাধীনতা অথবা যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। ভারত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার হচ্ছে একটি হাতিয়ার যার সাহায্যে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছা সম্ভব। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে (আওয়ামী লীগ) সরকার গঠনের সুযোগ দেয়ার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন। কারণ তারাও পাকিস্তানি ও লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী তাদেরকে ন্যায্য অধিকার দিতে হবে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনার ফলে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে। মুফতী মাহমুদ বলেছিলেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং ইয়াহিয়া ও ভুট্টো পাকিস্তান টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী নন। দর্শনার্থীদের মধ্যে জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী, আব্দুস সবুর খান, মৌলভী ফরিদ আহমদ ও সিরাজুল হক ছিলেন খুবই অনুগত পাকিস্তানি। মুক্তিবাহিনী মৌলভী ফরিদকে হত্যা করে। চট্টগ্রাম থেকে পালানোর সময় ফজলুল কাদের চৌধুরী ভারতীয় বাহিনীর হাতে বন্দী হন। বিহারীরা ছিল শেষ দিন পর্যন্ত অনুগত। সেপ্টেম্বরে আমি অতিরিক্ত সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করি। ডাঃ মালিকের কাছে টিক্কা খান গর্ভনরের দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেন। নিয়াজি লিখেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের শাসন করার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী ‘৭০ এর সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়া হলে পাকিস্তান ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারত। মুজিবের বিজয়ে ইয়াহিয়া ও ভুট্টো নাখোশ হন। কারণ নির্বাচনের পর এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইয়াহিয়াকে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে হবে এবং ভুট্টোকে বসতে হবে বিরোধী দলীয় নেতার আসনে যা তাদের আকাঙ্খার পরিপন্থী। তাই ইয়াহিয়া ও ভুট্টো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিয়ে আমাকে বার্তা পাঠান। আমি তার প্রস্তাব পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হামিদের কাছে পাঠিয়ে দেই। তিনি আমাকে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিয়ে পাকিস্তান ও সশস্ত্র বাহিনীর সম্মান রক্ষার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে বার্তা পাঠাই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শুধু বলেন আর কোন যুদ্ধ নয়। তিনি পশ্চিম পাকিস্তান রক্ষায় প্রেসিডেন্ট আমাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলে বিচলিত হয়ে পড়ি। ১৬ ডিসেম্বর আমি কাঁপা হাতে আত্মসমর্পণ দলিলে সাক্ষর করি। তখন আমার অন্তরে উত্থিত ঢেউ দু’চোখে বেয়ে অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ে। ফরাসী এক সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করে ‘এখন আপনার অনুভূতি কী, টাইগার? জবাবে বললাম, ‘আমি অবসন্ন।’ শেখ মুজিবকে ব্যবহার করে ভারত ও বাঙালিদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের সুযোগ ছিল। কিন্তু ভুট্টো মুজিবকে লন্ডনগামী বিমানে তুলে দিলেন।
প্রসঙ্গতঃ নিয়াজির লেখা গ্রন্থটির কোথাও মেজর জিয়ার নাম নেই।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2020 www.jhalakatibarta.com
Developed BY Website-open.com
error: Content is protected !!