সংবাদ শিরোনাম :

Advertisement

চোরদের ভয়ঃ শিশু প্রিয়ন্ত ১৪ হাজার টাকা তুলে দিতে চায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে!

চোরদের ভয়ঃ শিশু প্রিয়ন্ত ১৪ হাজার টাকা তুলে দিতে চায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে!

সোহেল সানি ::
প্রিয়ন্ত। বয়স সাত ছুঁই ছুঁই।
ওর শিশুতোষ মনগহীনে বাসা বেঁধেছে একটা “বড়ত্ব”। সেই বড়ত্বের উঁকিঝুঁকি নিরন্তর।
মরণব্যাধি
“করোনা” নিয়ে প্রিয়ন্তের মনেও শঙ্কা। মানুষের দুঃখে দুঃখিত ওর মায়াভরা মন। মৃত্যুর খবরে সে ভুলে গেছে খেলনার কথা। ভুলে গেছে আনন্দ। কেড়ে নিয়েছে হৈ-হুল্লোড়।
টিভি পর্দায় চোখ রেখেই ওর দিন পার। প্রতিনিয়ত ক’জনের প্রাণ গেলো- সেই খবর শুনতেই অপরাহ্ন হতে চোখ থাকে টিভির পর্দায়। আর কতজনের প্রাণ গেলো, সে খবর ছড়িয়ে দেয় বাড়িসুদ্ধ ছোটবড় সবার কাছে। বানারীপাড়া ছাপিয়ে বরিশালের অনেকেরই প্রিয়মুখ প্রিয়ন্ত। পিতা রাহাদ সুমন, বরিশালের সাংবাদিক এবং বানারীপাড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি হওয়ায় ওর একটা পরিচিত গড়ে উঠেছে। পিতার সাহচর্যে থাকার সুবাদে।
প্রাণবন্ত উচ্ছ্বল দুরন্ত এক শিশু। বরিশালের প্রায় সকল গণপ্রতিনিধিদের প্রিয় হয়ে উঠেছে হৃদয়গ্রাহী কথামালার সুবাদে। অনিন্দ্য সুন্দর প্রিয়ন্ত এখন বড়ই অন্তরজ্বালায় ভুগছে। শান্ত শান্ত মন তার অশান্ত এখন। কারণ অদম্য একটা ইচ্ছার প্রতিফলন পাচ্ছে না। একটু-আধটু করে সে বেশ কিছু টাকা জমিয়েছে। টাকার পরিমানটা ১৪ হাজার ছাড়িয়েছে। জমানো টাকাটা কি করে পৌঁছে দেবে ওর প্রিয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, সেটাই নিয়েই সে চিন্তিত। সে যেনো মনের ভেতরে এক মহাচিন্তার লালন। প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে নিজ হাতে জমা দেয়ার দুর্দমনীয় আকাঙ্খা রুখার সাধ্য কার? অমিত তেজে সে মুখে তুলে জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান। শিশুটি বলনে চলনে সত্যিই যেন উন্নতশির।
সাংবাদিক পিতার সাহচর্যে থাকা বিস্ময়কর এক প্রতিভা। পিতার হাতেও এ টাকা তুলে দিতে নারাজ। ত্রাণ চোরদের খবর সে শুনে প্রতিদিন। তা ওর কানে বাজে। তাই কষ্ট করে জমানো টাকাটা তুলে দিতে চায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে। শিশুপুত্রের আশা পূরণে পিতাও নির্বিকার। গল্পগুজবে ওর মন ভরাতে পারেনা। দুরন্ত শিশুটি কদিন ধরেই রাত্রী নিশীথ যাত্রী। নির্ঘুম চোখ। নজরকাঁড়া আঁখিযুগলে ওর কান্নার সাঁতার। অশ্রুজলপ্রপাত থামবে কিভাবে? পিতাকে তাগিদ, চাচ্চুকে ফোন দাও। সায় না পেয়ে নিজেই মুঠো ফোনে ফোন দিলো আমাকে। আমি ফোনের এপাশ হতে- হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে প্রবলবেগে ধেয়ে আসলো, একটি কন্ঠ- সানি চাচ্চু, আমি প্রিয়ন্ত, ঢাকা আসবো। গরীব-দুঃখীদের জন্য ১৪ হাজার টাকা জমিয়েছি। সঙ্গে আনছি, আমি
প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবো, তুমি নিয়ে যাবে তো? বরিশালের ভাষায় নয়, সুন্দর করে কথা ওর মায়ের ভাষায় – মানে যশোরের ভাষায়। প্রচন্ড কথাপটু প্রিয়ন্ত। ফোনে মনে হলো ওর উচ্চ কন্ঠস্বরটা ক্ষীন হয়ে আসলো। আমি বললাম, কিরে আব্বু তুমি এভাবে বলছো কেনো? মনে হলো, কন্ঠটা ওর ভারাক্রান্ত। অনেকটা নির্জীব হয়ে গেছে। হ্যালো, হ্যালো বলতেই – কান্নার শব্দ। করুণ কান্নার সুরে আচমকা ধাক্কায় আমার মনের কপাটগুলো খুলে গেলো। আমি সান্ত্বনার বানী খুঁজেছিলাম, পাচ্ছিলাম না।
প্রিয়ন্ত আমার ভালোবাসায় ছোট্ট হতেই অনুরক্ত। অতিশয় ভক্ত। আমারও দারুণ পছন্দ। ভীষণ প্রিয় ওর অনিন্দ্য সুন্দর মুখখানী। ওর মিষ্টকন্ঠের সদুত্তর খুঁজে চললাম। ফাঁকে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে সে বলে চললো- চাচ্চু, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তোমার তো বাসায় কত ছবি দেখি, তুমি নিয়ে যাবে আমায়? আমি টাকাটা দিয়ে আবার চলে আসবো।
আমি বললাম
চাচ্চু, তুমি তো তোমার আব্বুকে দিতে পারো – আব্বু চাল- ডাল কিনে গরীবদেরকে দিয়ে দিবে। নাহ। ভাবগম্ভীর কন্ঠে প্রিয়ন্ত বললো, টিভিতে শুনছি চোরেরা সব খেয়ে ফেলে। তোমার আব্বু তো বলেছে ওখানে চোর নেই। প্রিয়ন্ত এবার দীপ্ত কন্ঠে বললো, না থাকুক, আমি টাকাকা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে দিবো। শেষ পর্যন্ত প্রিয়ন্তকে কথা দিয়ে বলতেই হলো – চাচ্চু ঈদের পরে তুমি এসো, তোমায় আমি নিয়ে যাবো। প্রিয়ন্ত ফোন রাখার পর আনন্দাশ্রুতে আমিও ভাসলাম। আর ভাবলাম, ছোট্ট শিশুতোষ মনেও আমাদের গণপ্রতিনিধি নামধারী চোরেরা কতটা না বড় দাগ কেটে দিয়েছে। হায়! জাতি হিসাবে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2020 www.jhalakatibarta.com
Developed BY Website-open.com
error: Content is protected !!